ইরানি কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ!

 ২০২০-০১-০৪ ১৯:৩২:১৩   বিভাগ: লেখালেখি ও মুক্তমত

কামরুজ্জামান নাবিল |

ইরানি শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি সবার কাছে যিনি হাজি কাসেম নামে পরিচিত। ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হবার খবর যখন ইরাক-ইরান সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে ছড়িয়ে পড়ে ঠিক তখন ইরানি জনগণের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া।

ইরানিদের কাছে হাজি কাসেম শুধু একটি নাম ছিল না, ছিল একটি নক্ষত্র। যিনি অনেকের কাছে ‘শত্রুদের দুঃস্বপ্ন’ আর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনি যাকে ‘জীবন্ত শহীদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরে ঘটিত ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বা আইআরজিসির প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন নিহত এই কমান্ডার সোলাইমানি। যিনি ধীরে ধীরে আল কুদসের শাখাগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন, ইরাকে নিজের ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়ে সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটাতে ভূমিকা রেখেছিলেন বললে ভুল হবে না।

৬৩ বছর বয়সী জেনারেল সোলাইমানির চিন্তাশক্তি আর সামরিক কৌশলই মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক প্রভাবে ভূমিকা রেখেছিল।

লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ, ইয়েমেনের হুতি ইত্যাদি সংগঠনের কাছেও যার ছিল গ্রহণযোগ্যতা, যা পশ্চিমা বিশ্বকে এবং ইসরাইলকে ভাবিয়েছিল। এটাও অস্বীকার করার নই যে, ইসরাইলের মোসাদ আর যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ এর হিট লিস্টে সোলাইমানি সর্বাগ্রেই ছিলেন।

এর সূত্র ধরেই কয়েকবার হামলার চিন্তা করেও কোনো কারণে এতটা সময় নিতে চেয়েছিল তারা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্প সেই অপেক্ষার দিন শেষ করে নির্বাচনের আগেই জনগণের দৃষ্টি কাড়তে জেনারেল সোলাইমানিকে সরাসরি হত্যার নির্দেশ দেন।

একজন প্রেসিডেন্ট যখন নিজ থেকে ঘোষণা দিয়ে অন্য একটি দেশের সামরিক প্রধানকে হত্যার নির্দেশ দেন তখন ভাবায় যায় জেনারেল কাসেমি শুধু একজন সামরিক প্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিরোধীদের ঘুম হারাম করা শত্রুদের দুঃস্বপ্ন।

তবে কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন?

বলা বাহুল্য, ইরান এমন একজন নক্ষত্র হত্যার জবাব সহজভাবে দিবে না। এ হত্যার পরে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, অপরাধীদের জন্য কঠোর প্রতিশোধ অপেক্ষা করছে। অনেকে ভাবতে পারেন, এ অবস্থায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে না।

এর মূল কারণ হিসেবে তারা দেখছেন ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের প্রতিনিয়ত দেয়া নতুন নতুন অবরোধের মুখে ইরানের অর্থনীতি খারাপ অবস্থাকে। সম্প্রতি ইরানের অর্থনীতি নিয়ে ইরানের রাজপথে কিছু সংখ্যক ইরানিদের বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে।

অনেকে অর্থনীতি এই অবস্থা নিয়ে সরকারের প্রতি নাখোশ বলেও দেখা যায়। এ কারণে অনেকেই মনে করেন ইরান সরকার যদি যুদ্ধেরও সিদ্ধান্ত নেয় তবে জনগণের কাছে থেকে তেমন একটা সাড়া পাবে না। কিন্তু আসলেই কি তাই?

আমরা যদি ইরানের আশির দশকের ইতিহাসের দিকে তাকায় তবে দেখব ১৯৭৯ সালে ইরান যখন কেবলমাত্র ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন ইরান গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করছে ঠিক সেই মুহূর্তে পশ্চিমারা এক বছরের মাথায় ১৯৮০ সালে ইসলামি বিপ্লবের নাজুক অবস্থাকে ব্যবহার করে ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতে পেছন থেকে উজ্জীবিত করে।

এমন অবস্থায় ইরানের সে সময়ের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির ডাকে শহীদ হওয়ার উন্মাদনা নিয়ে ইরাকি মেশিনগান আর মাটিতে মাইন পোঁতা এলাকা পেরিয়ে দলে দলে ইরানিরা ইরাকি অবস্থানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে।

সর্বোচ্চ নেতার ডাকে ইরানিরা নিজেদের দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে আসতে গিয়ে নিহত হন প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ইরানি।

এই মুহূর্তে সবার চোখ ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির কুদস ব্রিগেডের নতুন প্রধান মেজর জেনারেল ইসমাইল কায়ানির দিকে। তাদের সিদ্ধান্তই বলে দিবে জেনারেল সোলাইমানির মতো নক্ষত্রের জবাব ইরান কিভাবে দিবে।

লেখক: কামরুজ্জামান নাবিল

শিক্ষার্থী, ডক্টর অফ মেডিসিন (এমডি) ইস্পাহান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান


আর্কাইভ
জানুয়ারি ২০২০
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ডিসেম্বর   ফেব্রুয়ারি »
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

ফেইসবুকে আমরা